
সবুজ মাঠে জন্ম নেওয়া ফসল বাজারে পৌঁছেই যদি বন্দী হয়, আর সেই ফসল বাঁচাতে গিয়ে কৃষক যদি বিষের আশ্রয়ে ঠেলে দেওয়া হয়—তবে সেটি শুধু বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, এটি একটি নীরব কৃষি-অপরাধ। দিনাজপুরের এন এম বাহাদুর বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা কাঁচামাল সিন্ডিকেট এবং মাঠে মাঠে ছড়িয়ে পড়া বালাইনাশক নির্ভর অসাধু চক্রে আজ শীতকালীন সবজি চাষীরা পড়েছেন বহুমুখী সংকটে।
বাজার যেখানে বন্দী কৃষক
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় কাঁচামালের মোকাম এন এম বাহাদুর বাজার। প্রতিদিন ভোরে শত শত কৃষক এখানে সবজি নিয়ে আসেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজারে প্রবেশের পর কৃষক ইচ্ছা করলেও সরাসরি কোনো পাইকার বা খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন না। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিক্রি করাই অলিখিত নিয়ম।
এই নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করলে কৃষকদের হুমকি, মানসিক চাপ এমনকি সামাজিকভাবে একঘরে করার অভিযোগও উঠে এসেছে। একাধিক কৃষক জানান, বাজারে দাম নির্ধারণ হয় আগেভাগেই—ফসল নয়, দাম নিয়ন্ত্রণ করে সিন্ডিকেট।
গুজব ছড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও গুজব তৈরির কৌশল। সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা প্রকাশ্যে বলেন—“এবার কৃষক মাঠে মারা গেছে, সবজির দাম নেই।” অথচ বাস্তবে উৎপাদন ভালো থাকলেও কৃষককে বাধ্য করা হচ্ছে পানির দামে সবজি বিক্রি করতে। একই সবজি পরে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ দামে।

দিনাজপুরের বৃহত্তম সবজি বাজার এন এ মার্কেট বাহাদুর বাজার
মাঠে আরেক সিন্ডিকেট
বাজারের সংকটের পাশাপাশি মাঠে মাঠে চলছে আরেকটি নীরব সিন্ডিকেট। শীত ও কুয়াশার কারণে সবজি খেতে দেখা দিচ্ছে নানা রোগ-বালাই। কৃষক যখন পরামর্শ নিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে যান, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পাঠানো হচ্ছে নির্দিষ্ট বালাইনাশক ডিলারের কাছে—এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ডিলার ও ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা বারবার অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগের সঠিক নাম বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না দিয়েই বলা হচ্ছে—“ভাইরাস।” এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।
ফসলও বাঁচে না, কৃষকও না
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বারবার বালাইনাশক প্রয়োগ করেও অনেক ক্ষেতেই রোগের প্রতিকার মিলছে না। বরং জমির উর্বরতা কমছে, উপকারী পোকা নষ্ট হচ্ছে। কৃষকের ভাষায়—“ফসল বাঁচাতে গিয়ে আমরা নিজেরাই শেষ হয়ে যাচ্ছি।”
দায় কার?
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আবু জাফর মো. সাদেক জানান, কৃষকদের জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকি চলছে। তবে বিপণন ব্যবস্থার দায়িত্ব ভোক্তা অধিকার ও প্রশাসনের—এমনটাই দাবি তাদের।
সংকটের বিস্তৃতি
চলতি মৌসুমে দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়ছে না। কারণ, মাঠ থেকে বাজার—দুই প্রান্তেই কৃষক আটকে পড়ছেন সিন্ডিকেটের বেড়াজালে।
শেষ কথা
সবজি মাঠে আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে নেই। বাজার আছে, কিন্তু ন্যায্য দাম নেই। রোগ আছে, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা নেই। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই—এই নীরব সিন্ডিকেটের দায় নেবে কে? আর কবে মুক্ত হবে দিনাজপুরের কৃষকের জীবনরেখা?