
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের কৃষক মোকাররম হোসেন (৬৮)—পিতা সামসেদ আলী। জমিজমা খুব বেশি নেই। নিজের সামান্য জমি আর কিছু বন্ধক নেওয়া জমিতে শীত মৌসুম এলেই তিনি চাষ করেন নানান শাকসবজি। কৃষিই তার জীবন, কৃষিই তার একমাত্র ভরসা।
চলতি মৌসুমে তিনি—১২ শতক জমিতে ফুলকপি,২০ শতক জমিতে আলু,সাড়ে ৭ শতক জমিতে লালশাক ও পুঁইশাক, ১২ কাঠা জমিতে বেগুন,এবং সাড়ে ৬ শতক জমিতে লাউশাক আবাদ করেছেন। লাউশাক থেকেই ইতোমধ্যে তিনি বিক্রি করেছেন প্রায় ২৬ হাজার টাকা। সামনে আরও চার মাসে এখান থেকে ৫০–৬০ হাজার টাকা আয়ের আশা তার। কিন্তু এই আশার ওপরই নেমে এসেছে একের পর এক ধাক্কা।
বেগুনে অজানা রোগ, কৃষকের অসহায়তা
এই মৌসুমে বেগুন চাষে নেমেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। মোকাররম হোসেন বলেন—“সব বেগুন গাছ বেগুনি রং ধরেছে। ফুল আসে, কিন্তু টেকে না—মরে যায়।”
এই রোগ শুধু তার জমিতে নয়; এলাকার অধিকাংশ বেগুন চাষীর ক্ষেতেই একই অবস্থা। স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে কার্যকর সমাধান মেলেনি। মাঠপর্যায়ের উপসহকারী কর্মকর্তারা এটিকে ভাইরাসজনিত রোগ বলে ধারণা করলেও, রোগের সুনির্দিষ্ট নাম কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রতিকার এখনো জানাতে পারেননি।
তিনগুণ ওষুধ, শূন্য ফল:
আর্থিক অক্ষমতার কারণে মোকাররম হোসেনসহ অনেক কৃষকই সার, বীজ ও বালাইনাশক কিনছেন বাকিতে। ফসল উঠলে সেই টাকা কেটে রাখা হয়।
“আমরা কোম্পানির লোকজন যেটা বলে, সেটাই ব্যবহার করি। তারা মাঠে মাঠে আসে, হ্যান্ডবিল দেয়, ওষুধ ধরিয়ে দেয়।” আগে যেখানে একই জমিতে দুইবার ভিটামিন ও ওষুধ দিলেই ফল মিলত, এখন সেখানে তিনগুণ বালাইনাশক ও ভিটামিন ব্যবহার করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
ওষুধের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন?
মোকাররম হোসেন আরও বলেন—“আমরা যে ওষুধ, বালাইনাশক বা ভিটামিন ব্যবহার করি—নাম যাই বলা হোক না কেন—সেগুলো আদৌ কতটা মানসম্মত, তা যাচাই করতে এখন পর্যন্ত কোনো বিভাগকে মাঠে নামতে দেখিনি।” দিনাজপুরের বিভিন্ন হাট, বাজার, রাস্তার ধারের দোকান ও পথে-ঘাটে যেসব সার, বীজ ও বালাইনাশকের দোকান রয়েছে, সেগুলোর মান নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার স্পষ্ট দাবি—” কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত মনিটরিং জরুরি। নইলে কৃষক থাকবে পরীক্ষার ইঁদুর, আর ফসল হবে অনিশ্চয়তার শিকার।
বাজারে আরেক নিষ্ঠুর বাস্তবতা
ক্ষেতের রোগের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ না হতেই বাজারে শুরু হয় সিন্ডিকেটের দাপট। মোকাররম হোসেন বলেন—“আমাদের শাকসবজি চারটি স্তর পার হয়ে ভোক্তার কাছে যায়। আমরা আলু বিক্রি করি ৯–১০ টাকায়, আর ভোক্তারা কিনছে ৪০–৫০ টাকায়।” এই ব্যবধানের টাকা চলে যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে। “শাক উৎপাদন করি আমরা, আর মালিক সেজে বসে থাকে ওরা। ধমক দেয়, কখনো হাতাহাতিও হয়। এদের মাস্তান আছে।”
সরেজমিনে সিন্ডিকেটের ছায়া:
দিনাজপুরের বাহাদুর বাজার ঘুরে দেখা যায়—কাঁচামাল আরতদার সমিতির সদস্য মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম নিজেই বিভিন্ন সবজির দাম নির্ধারণ করছেন। বাজার ঘিরে থাকা অন্তত ২৫ জন যুবক গ্রাম থেকে আসা কৃষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। ক্যামেরা দেখতেই তারা অস্বস্তিতে পড়ে যায়, পরিচয় নিশ্চিত হতেই কয়েকজন দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয় সূত্র জানায়—বাহাদুর বাজার কাঁচামাল আরতদার সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদকের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে এই সবজি সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে সভাপতি রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
কৃষকের শেষ দাবি
ক্ষেতে—অজানা রোগ,কাজ না করা ওষুধ, মানহীন বালাইনাশকের সন্দেহ।বাজারে—সিন্ডিকেটের দাপট,ন্যায্য দামের বঞ্চনা। মোকাররম হোসেনের মতো হাজারো কৃষকের একটাই আকুতি—কৃষি বিভাগ, ভোক্তা অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বিত, কঠোর ও দৃশ্যমান মনিটরিং।
নইলে—মাটিতে ঘাম ঝরানো কৃষক থাকবে শুধু উৎপাদক,আর ফসল, দাম ও লাভ—সবই হারিয়ে যাবে সিন্ডিকেট, রোগ আর অব্যবস্থাপনার অন্ধকারে।