
বাংলাদেশের একমাত্র বাণিজ্যিকভাবে আনার এর চাষ হচ্ছে দিনাজপুরে। দেশের চাহিদা মেটাতে দুই বন্ধুর সফল উদ্যোগে এগিয়ে যাবে। স্বনির্ভরের পথে তাদের হাত ধরে।
দিনাজপুর সদর উপজেলায় দুই যুবক তাদের নিজ উদ্যোগে ৪ একর জমিতে বিদেশি আনার ফলের বাগান সৃজনে সফলতা অর্জন করেছেন। মনোরম দৃশ্যে থোকায় থোকায় আনার ফল ঝুলছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার রানীগঞ্জ বেলবাড়ী গ্রামে পৌঁছালে রাস্তার পাশেই গ্রীন লিফ এগ্রো ফার্ম নামের বিশাল একটি আনার বাগান সৃজন করা হয়েছে। মোঃ নাদিম হোসেন ও মনিরুজ্জামান চৌধুরী এই দু’জন বন্ধুর সফল প্রচেষ্টায় আনার বাগানটি গড়ে তুলেছেন। প্রায় ৪ একর জমির উপরে সৃজন করা বাগানে আনারের গাছ রয়েছে এক হাজার এক’শটি। গত বছর আনার ফল তেমন একটা না ধরলেও স্বাদ, ঘ্রাণ রঙ এবং আকার সবদিক থেকেই বিদেশি আনারের চেয়ে কোন অংশে কম নয় বলে বাগান মালিকেরা দাবি করেন। তবে এবার ওই আনার বাগানে প্রত্যেকটি গাছে প্রচুর পরিমানে ফল ধরেছে।
বাগানের এক একটি গাছে মনোরম দৃশ্যে থোকায় থোকায় ঝুলে রয়েছে আনার ফল। প্রথম দেখায় এটি বিদেশের নেপাল বা ভারতের কাশ্মির মনে হবে। কিন্তু না এটি এই দেশের দিনাজপুর সদর উপজেলায় অবস্থিত একটি সফল আনার ফলের বাগান। মাটি ও আবহাওয়া অনুকুলে না হলেও জেলার সদর উপজেলার বেলবাড়ী গ্রামে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ আনার ফলের বাগান।

উদ্যোক্তা দুই যুবকের সাথে কথা বলে জানা যায়,তারা পরীক্ষা মুলক ভাবে এই বিদেশি আনার ফল চাষ করেই পেয়েছেন ব্যাপক সফলতা। একটি বাগানের এক হাজার এক’শ গাছ থেকে এবার অন্তত ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকার আনার ফল বিক্রির আশা করছেন তারা। বাগান মালিক জানায়, এখন থেকেই অনেক পাইকার আগাম তাদের বাগানের আনার ফল ক্রয়ে আগ্রাহ দেখাচ্ছেন।পাইকারেরা খোঁজ খবর নিচ্ছেন কবে নাগাদ আমরা আনার ফল ভেঙ্গে বাজার জাত করব। ফল ক্রয়ের জন্য অনেক পাইকারদের আগ্রহ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
উদ্যোক্তা যুবকদ্বয় জানায়, ভিটামিন সমৃদ্ধ আমদানী নির্ভরশীল আনার ফল (বেদানা)। নেপাল, ভারত, চীন. দক্ষিন আফ্রিকাসহ বেশ কিছু দেশ থেকে প্রতি বছর শত শত টন ফল বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে আমদানী করা হয়। তবে এবারই প্রথম বৃহৎ আঙ্গিকে বাংলাদেশেই চাষ করা হয়েছে, আমদানী নির্ভর এই আনার ফল। বাগানে চারা রোপনের ৪ বছর পর, এবারে গাছ গুলোতে ফল এসেছে। ইতি মধ্যে ফলে ফলে ভরে গেছে গোটা বাগান। একেকটি গাছে ফল ধরেছে ২০ থেকে ৬০টি করে। চলতি আগস্ট মাসের শেষ দিকেই এসব ফল বিক্রি করতে শুরু করবে কৃষি উদ্যোক্তা দুই যুবক বাগান মালিক।
উদ্যোক্তা যুবকদ্বয় বলেন, আনার চাষের ওপর ভারতের মুম্বাইয়ের একটি কৃষি খামারের অধীনে প্রশিক্ষন নিয়ে দিনাজপুরে গত ৪ বছর পূর্বে আনার বাগান সৃজন করেন কৃষি উদ্যোক্তা মোঃ নাদিম হোসেন ও তার বন্ধু মনিরুজ্জান। প্রথম অবস্থায় অনেকেই আনার বাগান সৃজনে নিরুৎসাহিত করেছিল। দেশে সর্ববৃহৎ আনারের বাগান গড়তে পেরে গর্বিত বলে নাদিম ব্যাক্ত করেন।
সরেজমিনে বাগান পরিদর্শনে গেলে মোঃ নাদিম বলেন, আমি এবং আমার পার্টনার মনিরুজ্জামান চৌধুরী এখানে প্রায় ৪ একর জমির উপর এক হাজার এক’শ আনার গাছের চারা রোপণ করে ছিলাম। গত বছর গাছ গুলোতে কিছু আনার ফল ধরে ছিল। কিন্তু এবার প্রত্যেকটি গাছে প্রচুর পরিমানে ফল এসেছে। তিনি বলেন, এবার অন্তত ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকার আনার ফল বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তিনি বলেন, কোন ধরনের রোগবালাই দেখা না দিয়ে একেকটি গাছ কমপক্ষে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। তিনি বলেন, যত দিন যাবে, এসব গাছ থেকে ততই বেশী ফল পাওয়া যাবে। প্রথম বারেই সফল হওয়ায় এই বাগান আরও সম্প্রসারণ করবেন বলে জানায় বাগান মালিক। আগামীতে এই ফল উৎপাদন করে নিজের আর্থিক ভাবে লাভবানের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা কিছুটা হলেও সাশ্রয় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিনাজপুরে আনার চাষের সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন এই আনার বাগান দখতে ভীড় করছেন অনেক উৎসক মানুষ। দিনাজপুরে এই বাগানে গাছে থোকায় থোকায় আনার ঝুলতে দেখে অনেকেই আনার চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। বিদেশী এই ফল দিনাজপুরের মাটিতেও ফলানো সম্ভব-এটা দেখে অনেকেই পরামর্শ নিচ্ছেন বাগান মালিকের কাছে। ইতি মধ্যেই ঢাকা থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম, দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক মোঃ আফজাল হোসেন সহ পিসি বিভাগের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাগণ এই আনার বাগান পরিদর্শণ করেছেন।
দিনাজপুর হর্টিকালচার বিভাগের কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, বাংলাদেশে এত বড় আনারের বাগান আর কোথাও নেই। এই বাগানের সফলতা অর্জনে উদ্যোক্তা দুই যুবককে বাগান সৃজনের পর হর্টিকালচার বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
জেলার সদর উপজেলা কৃষি দপ্তরের মাঠ কর্মকর্তা মোঃ আবু বোরহান জানান, বেশ ঝুঁকি নিয়ে দুই বন্ধু মিলে এই আনার বাগানটি গড়ে তুলেছেন। উদ্যোক্তা দুই যুবক সদর উপজেলা কৃষি অফিসে তাদের সৃজন করা আনার বাগানের যে কোন সমস্যায় কৃষি অফিস সাধ্যমত তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ আফজাল হোসেন জানান, পরীক্ষা মুলক ভাবে দিনাজপুরের মাটিতে আনারের বাগান গড়ে উঠেছে। দিনাজপুরের মাটিতে পরীক্ষা মুলক ভাবে এই বিদেশী ফল চাষে সবধরণের পরামর্শ দিয়ে তাদের সহযোগীতা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোন সমস্যা হয়নি। যে গুলো বালাই বা রোগের সম্মুখীন হচ্ছে, তা মোকাবেলায় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সবরকম পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন,পরীক্ষা মুলক ভাবে আনার চাষ করে যেহেতু সফল হওয়া গেছে। আশা যায় দিনাজপুরের মাটি বিদেশী ফল আনার চাষের বেশ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই বাগান দেখে অন্যান্য তরুণ ও যুবকেরা কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে আনার চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন বলে তিনি ব্যক্ত করেন।