• সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

গাছে পানি দেওয়ার স্প্রিংক্লার পদ্ধতি একটি জল সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা

হোসেন মো. আবু সুফিয়ান, বিশেষ প্রতিবেদক / ৯১৮ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫

চীনের হুনান প্রদেশের চাংসা সিটি। চাংসা হুনান প্রদেশের রাজধানী। এটি চিনের ১৫ তম জনবহুল শহর। চাংসা মধ্য চিনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এখানে দেখা মেলে গাছে পানি দেওয়ার জন্য স্প্রিংক্লার পদ্ধতি একটি কার্যকর এবং জল সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা। দেশে ফিরে পিকেএসএফ এবং এমবিএসকে পরিচালনায় ও বাস্তবায়নে একটি ড্রাগন বাগানে স্প্রিংকলার সিস্টেমে পানি সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করেন বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল কৃষিতে বাংলা ডট কম এর বিশেষ প্রতিবেদক ও এমবিএসকে এর কৃষি অফিসার কৃষিবিদ হোসেন মো. আবু সুফিয়ান

চীন থেকে ফিরে কৃষিতে বাংলা ডট কম কে তাঁর বিশেষ প্রতিবেদন

হাট ছিলাম চাংসা সিটির লুসান রোড ধরে। দুপাশে সুন্দর করে গাছ রোপণ করা যেন সবুজের সমারহ । উপরে সবুজ শ্যামল ছাতার ন্যায় গাছগুলো ছায়া দিয়ে যাচ্ছে মেঘ হয়ে । হাঁটলেও মনে হচ্ছে না রোদ যেন গায়ে লাগছে মনে হচ্ছে শ্যামল সবুজ ছাতার মাঝ দিয়ে আমরা হেঁটে চলছি গন্তব্যে। পেীছালাম হুনান  ইউনিভার্সিটির শতাব্দি পুরাতন একাডেমিতে , হুনান ইউনিভার্সিটিতে। পাশেই রয়েছে মাও সেতুং এর ভাস্কর্য। বিভিন্ন মানুষের সমাগম সেখানে, সবাই সেই ভাস্কর্যটির সামনে দাড়িয়ে ছবি তুলছে, ছোট বাচ্চারা এলোমেলো দৌডিয়ে চলছে কিন্তু এত লোকের মাঝেও তারা ডিসিপ্লিন মেনে চলছে।, আমরা স্ট্যাচুটির সামনে দাঁডিয়ে কিছু ছবি তুললাম । কিছু চাইনিজ আমাদের হেল্প করলেন আমাদের ছবি তুলে দিলেন। আমাদের গন্তব্য ছিল শিয়াংজিয়াং নদীর পাড়।  শিয়াংজিয়াং নদীর কাছাকাছি যখন গেলাম তার আগে একটি বড রাস্তা ছিল সেই রাস্তাটা ক্রস করার সময ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতিটি ছিল খুবই চমৎকার, সেখানে কোন ট্রাফিক পুলিশ অবস্থান না করলেও সবাই ট্রাফিক আইন মেনেই রাস্তা পার হচ্ছে। যখন রেড লাইটগুলো জ্বলে উঠছিল তখন সকল গাড়িগুলো থেমে যাচ্ছে  এবং পথচারীদের একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্কিনে ভেসে উঠছে  এই সয়েরর মধ্যে সবাই রাস্তা পার হচ্ছে।  ভালো লাগলো যে ট্রাফিক সিগন্যালটা তাদের এত উন্নত ও মানুষরা  সচেতন।

শিয়াংজিয়াং নদীর তীর ধরে আমরা যখন হাঁটছিলাম তখন আমার চোখে পড়লো পানি দেওয়ার এক ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা। খুব কাছ থেকে নিবিড়ভাবে দেখলাম  গাছে পানি দেওয়ার ব্যবস্থাপনাকে। চীনের গাছে পানি দেওয়ার জন্য স্প্রিংক্লার পদ্ধতি একটি কার্যকর এবং জল সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে জল চাপ দিয়ে স্প্রিংকলারের মাধ্যমে ফসলের উপর ছিটিয়ে দেওয়া হয় যা বৃষ্টির মত দেখায় ।এটি একটি নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থা যেখানে পানি সরাসরি গাছের গোড়ায় না দিয়ে বাতাসে স্প্রে করা হয় যা মাটিকে আদ্র রাখতে সাহায্য করে। স্প্রিংকলারের  বিভিন্ন ধরনের মাথা পাওয়া যায় যেমন মাইক্রো  স্প্রিংক্লার যা বিভিন্ন আকারের গাছের জন্য উপযুক্ত। স্প্রিংক্লার সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে যা শ্রমিকের সময় ও প্রচেষ্টা  সাশ্রয় করে। স্প্রিংক্লার সিস্টেম সুন্দরকরে  সেটআপ করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যেন প্রতিটি গাছ ও ফুলের চারা  পরিমিতভাবে  পানি পায়।  প্রতিটা বৃক্ষ ও ফুলের চারা গুলো এমনভাবে ডিজাইন করে রোপন করা হয়েছে যা চোখে পডলেই নয়ন জুড়িয়ে যাবে  যেন মনে হবে কোন ফুলের শিল্পী তার তুলিতে সুন্দর করে প্রতিটি ফুল ও বৃক্ষ সুন্দর সমাহার করে মানুষের সামনে এuকে রেখেছেন। আমরা যেখানে অবস্থান করছিলাম সেই ডরমেটরির পাশেই ছিল হোউহু পার্ক যে পার্কে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। পার্কটির সৌন্দর্য, কাঠামো এবং দৃশ্যগুলিকে বাগান তৈরির কৈৗশলের অসাধারণ নমুনা বর্ণনা করা যায়, যা ঐতিহাসিক চৈনিক বাগানশিল্পের শৈলী এবং দুরান্ত স্থাপত্য দক্ষতা এবং সমৃদ্ধি প্রতিফলিত হয়। পার্কটি চমৎকার করে ডিজাইন করা হয়েছে, যার মাঝখানে রয়েছে একটি সুবিশাল জলরাশি আর এই জলরাশিকে বেষ্টন করে রয়েছে সবুজ শ্যামলের বিভিন্ন বৃক্ষের সমারহ, বিনোদনের এক দারুণ সমন্বয় আর মাটির নিচ দিয়ে ছুটে চলছে সাবওয়ে।  ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট রয়েছে সেখানে সবাই বসতে ও খেতে পারে ।  সেখানে বাচ্চা মাঝারি বযস্কসহ বিভিন্ন মানুষের সমাগম। সবাই তাদের অবসর সময় উপভোগ করছেন । শান্ত একটি পরিবেশ এত সুন্দর করে  সাজানো হয়েছে যেন দেখলেই মনে হয কেউ প্রতিটি জিনিস শিল্পীর চিত্রের ন্যায সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন ।সেই পার্ক দিয়ে যখন হাঁটছিলাম তখনও আমার চোখে পড়েছিল সেই স্প্রিংলার সিস্টেম যা বিভিন্ন গাছে এবং ফুলের গাছগুলোর পাশে  স্থাপন করা হয়েছে।  পানির অপচয রোধ করে অল্প পানিতে কিভাবে গাছগুলোতে সবসময় পানির ব্যবস্থা রাখা যায তার একটি অনন্য নিদর্শন এটি। ইউনিভার্সিটির ভিতরেও দেখেছি যে এই স্প্রিংকলার পদ্ধতি ব্যবহার করে বিভিন্ন গাছে পানি দেওয়ার ব্যবস্থাপনা। যখন নতুন কোন গাছ রোপন করা হচ্ছে সেই গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য  তারা এই পদ্ধতিতে পানি দিয়ে থাকে।  আমি সেভাবে মান্দারিন ভাষাটা বলতে পারিনা যতটুকু বলতে পারি তা খুব যথেষ্ট নয়। তারপরও নিজ আগ্রহ থেকে এই পদ্ধতিটি জানার জন্য চীনা লোকদের সাথে কথা বলি যারা এই স্প্রিংক্লার পদ্ধতিটি স্থাপন করছিলেন।  আমি যখন তাদের জিজ্ঞাসা করি যে এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করার উপকারিতা ও কিভাবে এগুলো ব্যবহার করা যায, তারা প্রথমে একটু হাসলেন এবং বললেন যে আমার বাসা কোথায? আমি বলি মুনজালাগুয়ো যার চাইনিজ অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। যথেষ্ট আন্তরিকতার সহিত তারা আমার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয় ও আমাদের দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করে। তাদের ভাষা বোঝার জন্য মাঝে মাঝে আমি ট্রান্সলেটরের হেল্প নিয়েছি আবার আমার কথা ট্রান্সলেট করে চীনা ভাষায় তাদের সামনে উপস্থাপন করেছি। এত দীর্ঘ সময় তারা এতটুকুও বিরক্ত বোধ করেনি।আসলে যতটুকু বুঝলাম শেখার জন্য কেউই বিরক্ত হয়না তবে নিজ আগ্রহে শিখে নিতে হয় এটাই হচ্ছে বাস্তব শিক্ষা। যদি আপনার বা আমার ইচ্ছা থাকে তাহলে আমাদেরকে নিজ আগ্রহেই সব কিছু শিখতে হবে। আপনি যখন এগিয়ে আসবেন আপনার জন্য অন্যরা এগিয়ে আসবে। তারা বলল যে এই ব্যবস্থাটা পানি অনেক সাশ্রয় করে এবং অল্প সময়ে পানি দেওযা যায়। পানির যত্রতত্র ব্যবহার না করে  পরিমিত ব্যবহার করে পানির ব্যবস্থা করা যায় যা একটি গাছের টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট।

পানি দেওয়ার এই স্প্রিংকলার পদ্ধতি দেখে আমারও অভিপ্রায় হয় আমাদের দেশের কৃষিতেও এই স্প্রিংকলার পদ্ধতিতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার। এর আগে যেহেতু আমি ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম নিয়ে কাজ করেছিলাম তাই সেই অভিজ্ঞতার আলোকে স্প্রিংকলার আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছিল। যখন দেশে ফিরে আসি তখন পিকেএসএফ এবং এমবিএসকে পরিচালনায় ও বাস্তবায়নে আমরা একটি ড্রাগন বাগানে স্প্রিংকলার সিস্টেমে পানি সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করি এবং এটি ছিল এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একেবারেই নতুন এবং আমাদের কাছেও নতুন একটি অভিজ্ঞতা। যখন পুরো বাগানে আমরা এই ব্যবস্থা স্থাপন করি এবং স্প্রিংকলার সিস্টেম থেকে পানি বৃষ্টির আকারে বের হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন সবাই আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠি এবং এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন সবাই  আনন্দে উচ্ছোসিত হয়ে উঠে । সেই সময়টা ছিল সারা জীবন মনে রাখার মতো।এমনকি যে মিস্ত্রিরা কাজ করেছেন তারাও ছবি তুলেছে ভিডিও করেছে তাদের ফেসবুক প্রোফাইলেও শেয়ার করেছে ।

 

আসলে খুবই ভালো লেগেছিল যে এরকম একটি ব্যবস্থা আমাদের দেশের কৃষিতে বিশেষ করে আমার নিজ এলাকায়  কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পেরে। এইজন্য সৃষ্টিকর্তার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। সর্বোপরি আশা করি এভাবেই দেশে কৃষি এগিয়ে যাবে ও নিরাপদ থাকবে।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!